আজ-  ,
basic-bank পরিক্ষা মূলক সম্প্রচার...
ADD
সংবাদ শিরোনাম :

ফয়েজ আহমেদ’র গল্প “ভালবাসি হয়নি বলা”।

“ভালবাসি হয়নি বলা”

-ফয়েজ আহমেদ।

 

জবা তলায় বসে বাদাম খাচ্ছে রিপন।সে একাই বসে আছে।কিছুক্ষন আগে তার সহপাঠীরা চলে গেছে। আজ কলেজে আর কোন ক্লাস নেই। বাদাম খাওয়া শেষে রিপনও চলে যাবে। রিপনের বাদাম খাওয়া প্রায় শেষ। যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে রিপন।এমন সময় একটি ষোড়শী মেয়ে এসে দাড়ায় রিপনের সামনে।

মেয়েটি দেখতে অনেক সুন্দর,গোল-গাল,স্লিম চেহারা। এত সুন্দর মেয়ে আগে চোঁখে পড়েনি রিপনের। মনে হচ্ছে জীবনে প্রথম এমন সুন্দর একটি মেয়ে দেখল রিপন। রিপন ভাবছে,এমন সুন্দর একটা মেয়ে যদি তার গালফ্রেন্ড হত। তার জীবন সাথী হিসেবে যদি এমন একজন মেয়ে পেত। ভালবাসার মানুষ হিসেবে মেয়েটাকে কল্পনায় আকে রিপন। রিপন ভাবে,এই মেয়েটা কি তার ভালবাসার মানুষ হতে পারেনা।রিপনের কল্পনায় আঘাত করে মেয়েটি বলে,ভাইয়া, কলেজের অফিস রুমটা কোন দিকে।
 রিপন খেয়াল করে মেয়েটির হাতে একটা সাদা প্লাষ্টিক ফাইল আছে। ফাইলে বিভিন্ন সার্টিফিকেট মনে হচ্ছে। রিপন মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে,আপনি কি এই কলেজে পড়েন। মেয়েটি উত্তর দেয়,না আমি ডিগ্রীতে ভর্তি হতে এসেছি। রিপন মনে একটা আশার আলো দেখতে পায়। যাক মেয়েটি যখন এ কলেজে পড়বে,তার হাতে একটা সুযোগ রয়ে গেল। মেয়েটিকে তার গাল ফ্রেন্ড করার একটা সম্ভাবনা সে দেখতে পাচ্ছে।
রিপন মেয়েটিকে বলে,আপনি ভর্তি হবেন। আসেন আমি আপনাকে অফিসে নিয়ে যাচ্ছি।মেয়েটি খুশী হয় বলে, মনে হচ্ছে রিপনের। মেয়েটি কলেজে নতুন। একজনের সহযোগীতা তার প্রয়োজন ছিল। রিপন মেয়েটিকে সহায়তা করার সুযোগ হাত ছাড়া করবেনা।সে মেয়েটার কাছাকাছি আসার এমন সুযোগ নষ্ট করতে রাজী নয়।
 রিপন কলেজের ডিগ্রী ২য় বর্ষের ছাত্র। কলেজে তার একটা পরিচিতি আছে। সে একটি ছাত্র সংগঠনের কলেজ শাখার সভাপতি। কলেজের ছাত্র,শিক্ষক,স্টাফ সবাই চিনে রিপনকে। তাছাড়া সবার সাথে রিপনের ভাল সম্পর্ক।  অফিসে যাওয়ার সময় রিপন নিজের নাম ও পরিচয় বলে মেয়েটিকে। এরপর রিপন মেয়েটির নাম জানতে চায়। মেয়েটি তার নাম রেশমী এবং বাড়ী নাটোর বলে জানায়। বাবার রেলের চাকুরীর সুবাধে তারা এখানে পনের বছর থেকে বসবাস করে। শহরের সাহেব পাড়ায় রেলের বাংলোয় তারা থাকে। মেয়েটির বাবা রেলের ওয়ার্কসপ এর বাবু। রিপন মেয়েটিকে কলেজ অফিসে নিয়ে যায়।
অফিসের হেড ক্লার্ক রেশমীর কাগজ পত্র দেখে ভর্তি ফরম রেডি করে দেন। এবং ভর্তির জন্য পাঁচ হাজার টাকা জমা দিতে বলেন। রেশমী বলে আমি ওত টাকা আনিনি। তিন হাজার টাকা আছে। হেড ক্লার্ক বলেন,পুরো টাকা লাগবে। রেশমী ক্লার্ককে বলে,ঠিক আছে আমি কালকে এসে ভর্তি হবো।  এবার মেয়েটি যেতে থাকে। এতক্ষন কোন কথা বলেনি রিপন। রেশমী মেয়েটির চলে যাওয়া দেখে তাকে আটকায় রিপন। রেশমীর কাছ থেকে ভর্তির ফরমটা নিজের হাতে নেয়।এরপর রেশমীকে একটু অপেক্ষা করার কথা বলে অধ্যক্ষের রুমে যায়।
কলেজ অধ্যক্ষের সাথে খুব ভাল সম্পর্ক রিপনের। রিপন কলেজের গরীব শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সময় সহযোগীতা করে থাকে। রিপন অধ্যক্ষ স্যারের কাছে তিন হাজার টাকায় রেশমীর ভর্তির অনুমতি নেয়। অধ্যক্ষ স্যার রেশমীর ভর্তি ফরমে নোট দিয়ে স্বাক্ষর করে দেয়।
রিপন ভর্তি ফরমটি এনে রেশমীর হাতে দেয়।  বলে অধ্যক্ষ স্যারের অনুমতি নিয়েছি।আপনি ওই টাকায় ভর্তি হতে পারবেন। রেশমী রিপনের এ কাজে আপত্তি করে।  বলে এটার দরকার ছিলনা। আমি কালকেই ভর্তি হতাম।পরে রিপনের কথায় সে টাকা জমা দিয়ে ভর্তি হয়।
আগামী দশ’তারিখ হতে কলেজে ক্লাস শুরু হবে। রেশমী যাওয়ার সময় রিপনের সাথে কথা বলে।রিপনকে ধন্যবাদ দিয়ে চলে আসে।
রেশমী চলে যাওয়ার পর রিপনের অসম্ভব এক ভাল লাগা কাজ করে। মনটা তার খুশীতে ভরে ওঠে। রেশমীকে ভর্তির কাজে সহযোগীতা করতে পারার এক আনন্দ কাজ করে রিপনের মনে। সে ভাবে অন্তত প্রথম দেখায় কাছে আসার একটা পরিবেশ সে তৈরী করতে পেরেছে। এখন সে রেশমীকে দেখলে কথা বলতে পারবে।  ওর কাছে যেতে পারবে। রিপনের মনে হয়,সে আজ একটা বড় ম্যাচ জিতে গেছে।
রিপন আজ আর কোন কাজে মন বসাতে পারছেনা। তার চোঁখের সামনে ভেসে আসছে শুধু,ওই মেয়েটির মায়াবি মুখ,তার চোঁখ। কিছুতেই সে মেয়েটিকে কল্পনা থেকে বের করতে পারছেনা। রেশমী নামের ওই মেয়েটিকে রিপন মন প্রান দিয়ে ভালবেসে ফেলেছে।
কিন্তু কেন এমন হচ্ছে রিপনের। কলেজে তো আরও অনেক মেয়ে আছে। তাদের মধ্যেও অনেক সুন্দর ও আর্কষনীয় মেয়ে আছে। রিপনের সহপাঠীদের মধ্যে অনেকে তাদের প্রেমে পাগল। কেউ হাবুডুবু খাচ্ছে তাদের প্রেমে। কিন্তু রিপনের তাদের দেখে কখনও এমন হয়নি। কিন্তু এই রেশমীকে প্রথম দেখেই কেন এমন হচ্ছে রিপনের।কলেজের সেরা সুন্দরীদের একজন তার ব্যাচের ময়ুরী। ওই ময়ুরী অনেকবার রিপনের কাছে আসার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পাত্তা দেয়নি রিপন। সহপাঠীরা অনেকবার বলেছে,ময়ুরী তোকে ভালবাসে। কিন্তু এগোয়নি রিপন।
আজ রেশমীকে প্রথম দেখেই রিপনের মন এত উদাস কেন। ভাবতে পারছেনা রিপন। তার শুধু মনে হচ্ছে,রেশমী তার চিরচেনা। চির আপন। সৃষ্টিকর্তা রেশমীকে তার জন্যই পাঠিয়েছে। রিপনের চেতনায় এখন শুধু রেশমী।রেশমীকে তার আপন করে পেতে হবে। রিপনের ভাবনায় রেশমী এখন পুরো জায়গা দখল করে আছে।
আজ ডিগ্রী প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হবে। রেশমী আজ অবশ্যই আসবে। সকালে ঘুম থেকে উঠে কলেজে যাওয়ার জন্য তৈরী হয় রিপন। নাস্তা করে অনেকটা আগেই সে কলেজে আসে। কলেজ সময়ের অনেক আগে বাড়ী থেকে বের হওয়ায় রিপনের মা জাহানারা বেগম প্রশ্ন করেছিল রিপনকে। আজ এত তাড়াতাড়ি কলেজে কেন যাচ্ছো। রিপন মাকে বলেছে আজ সকালে ক্লাস শুরুর আগে স্যারের কাছে নোট নিতে হবে। স্যার একটু আগেই যেতে বলেছে।
রিপন কলেজের জবা তলায় দাড়িয়ে আছে। যেখানে প্রথম রেশমীর সাথে ওর দেখা হয়েছিল। জবা তলা জায়গাটি কলেজের প্রবেশ পথে। ওখান থেকে সবাইকে ভাল ভাবে দেখা যায়। রিপন ভাবছে,রেশমী কলেজে প্রবেশের সময় তাকে দেখবে এবং অবশ্যই কথা বলবে।
অনেক নতুন ছাত্র-ছাত্রী আসছে। এখনও আসেনি রেশমী। রিপনের চাতক দু’টো চোঁখ শুধু রেশমীকে খুজছে। রিপনের হৃদয়ে একটা উত্তেজনা কাজ করছে।
দশ’টা বেজে গেছে। ক্লাস শুরুর আর পনের’মিনিট বাকী আছে। তাহলে কি রেশমী আজ আসবেনা। রেশমীকে সে কি আজ দেখতে পাবেনা।ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে,রিপনের মানষিকতা।রেশমীর সাথে তার শেষ দেখা হয়েছে,পাঁচ’দিন আগে।ওর ভর্তির দিন। এই পাঁচ’টা দিন সে কোন কাজে মনোনিবেশ করতে পারে নাই। দিবা-নিশী সে শুধু রেশমীকে ভেবেছে। আজকের দিনটার জন্য সে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিল। আজ সে দ্বিতীয় বার দুচোঁখ ভরে রেশমীকে দেখবে। তার মনের অবশান্তি দূর করবে।
রিপনের ভাবনার আকাশে কালো চিন্তার মেঘ একটা রেখা টেনে দিয়েছে। আকাশ কুসুম অনেক ভাবনায় হারিয়ে গেছে রিপন। এমন সময় ভাইয়া কেমন আছেন,শব্দে  সম্বিৎ ফিরে পায় রিপন। এযে রেশমী। ভাল আছি বলে,রিপন জিজ্ঞেস করে আপনি কেমন আছেন। কলেজে আসতে এত দেরী যে,জিজ্ঞেস করে রিপন। রেশমী বলে,ভাইয়া,আপনি আমাকে আপনি নয়,তুমি করে বললে,খুশী হবো। আপনি আমার সিনিয়র।
রিপন মনে মনে খুব খুশী হয়,রেশমীর কথায়। সে তো তাই চায়।রেশমীর কাছে আসতে চায়। ডাকতে চায়,মনের মাধুরি মিশিয়ে, তুমি বলে। কিন্তু এখনই অতটা হালকা হতে চায়না রিপন। সে যতটা সম্ভব রেশমীর কাছে,আরো আন্তরিক হতে চায়। তাই রিপন বলে,প্রথম প্রথমতো তাই “তুমি” শব্দটা আসতে চায়না।
প্রথম ক্লাসের সময় প্রায় হয়ে গেছে,রিপন বলে চলেন,আপনাকে ক্লাসটা দেখিয়ে দেই। রিপন জানে,আজ রেশমীর প্রথম ক্লাস। সে ক্লাস চেনেনা। রেশমী রিপনের মুখে আবার “আপনি”সম্ভোধন শুনে কৃত্রিম রাগ দেখায় রিপনকে। বলে ভাইয়া আবার “আপনি’। এর পর আমি কিন্তু আপনার সাথে কথা বলবো না। রেশমীর এমন কথা শুনে রিপন বলে,ঠিক আছে,আর হবেনা। এবার চলেন। রেশমী এবার রেগে গিয়ে বলে ভাইয়া আবার। রিপন বলে,সরি চল এবার।
রিপন আর রেশমী এক সাথে হেটে যাচ্ছে। রিপনের মনে বিশাল আনন্দ বয়ে যায়। রেশমীর কলেজের প্রথম দিনে সে রেশমীর কাছাকাছি পাশাপাশি হাটছে। এ এক অন্যরকম অনুভুতি। রিপন রেশমীকে তার ক্লাস রুমে দিয়ে নিজের ক্লাসে আসে। রিপনের মন আজ অনেক উচ্ছ্বসিত। আনন্দে ভরা রিপনের হৃদয়।
বাংলা প্রভাষক লেকচার দিচ্ছেন। লাল সালু উপন্যাস থেকে। কিন্তু কোন মনোযোগ নেই রিপনের। সে শুধু রেশমীকে নিয়ে একটা সুখ স্মৃতির কল্পনা করে যাচ্ছে। বাংলা প্রভাষক লেকচার শেষে ছাত্র/ছাত্রীদের প্রশ্ন করছেন। সবাই উত্তর দিচ্ছে। কিন্তু কোন মনোযোগ নেই রিপনের। সে রেশমীকে নিয়ে হারিয়ে গেছে কল্পনার নীল জগতে।
চোঁখ এড়ায়নি প্রভাষকের। প্রভাষক এবার
রিপনকে দাড়াতে বলেন। প্রভাষকের কলে চেতনা ফেরে রিপনের। প্রভাষক প্রশ্ন করে,মজিদের প্রথম স্ত্রীর নাম বল। রিপন চমকে যায়। সে তো স্যারের লেকচার শুনেনি। এই প্রশ্নের উত্তর তার জানা আছে। যদি জটিল প্রশ্ন করে।  উত্তর দিতে না পাড়লে স্যার তো অপদস্ত করবে। রিপন উত্তর দেয়, স্যার রহিমা। প্রভাষক বলে,তোমার ক্লাসে মনোযেগ নেই কেন। রিপন বলে স্যার আজ শরীরটা ভাল নেই। আর কোন প্রশ্ন করেনি প্রভাষক।
কলেজ ছুটির পর রিপন গ্যারেজ থেকে তার মটর সাইকেলটা নিয়ে কলেজের মুল গেটে দাড়ায়। সে রেশমীকে তার বাড়ীতে পৌছে দেয়ার প্রস্তাব করবে। রেশমীর আরো কাছে আসতে চায় রিপন। রেশমী এসেছে। রেশমী রিপনকে দেখে বলে,ভাইয়া আসি। কাল দেখা হবে। রিপন সাহস করে রেশমীকে বলে,রিকসায় যাওয়ার দরকার কি। ওই পথে তো আমি বাড়ী যাব। তোমাকে মোড়ে নামিয়ে দিয়ে যাব। রেশমী বলে,না থাক ভাইয়া। আপনি যান। আমি চলে যাব। রেশমীর কথায় আপত্তি করে রিপন,বলে না আস। অসুবিধা কি,আমি তোমাকে নামিয়ে দিব। আর আপত্তি করেনি রেশমী। সে এগিয়ে এসে রিপনের বাইকের পিছনে বসে।
রিপন আস্তে ধীরে চালাচ্ছে তার বাইক। পিছনে বসা রেশমী। রিপন একটু সময় নিতে চায়। অল্প রাস্তা। জোরে গাড়ি চালিয়ে তার জীবনের আজকের অন্যরকম দিনটা সে সংখিপ্ত করতে চায়না। রিপনের ইচ্ছে হয়,ইস পথটা যদি বড় হত। তাহলে সে অনেক বেশী সময়,এই সুখময় সময়টা উপভোগ করতে পারত। কিংবা এই পথটা যদি শেষ না হত। বাইকের ঝাকুনিতে রেশমীর কোমল নরম শরীরের ষ্পর্ষে পরম আবেশে হারিয়ে যায় রিপন। তার হৃদয়ে খেলে যায় অন্য রকম এক শিহরন। রিপন রেশমীকে তার বাড়ীর মোড়ে নামিয়ে দিয়ে বাড়ীতে চলে আসে।
রেশমী বাইক থেকে নেমে রিপনকে তাদের বাড়ীতে চা খেতে বলেছিল। রাজী হয়নি বিপন। বলেছে আরেক দিন আসব। রিপন আজ অন্যরকম এক আনন্দে আনন্দিত,শিহরিত। সে হৃদয়ে ভালো লাগার আবেশে পুলকিত। রিপন ঠিক করে,আগামীকাল কলেজে সে,রেশমীর সাথে মিট করবে। বলবে তার ভালবাসার কথা।
আজ রেশমীর কলেজের দ্বিতীয় দিন। সময়ের আগেই কলেজে এসেছে রিপন। জবা তলায় অপেক্ষায় আছে,কখন আসবে রেশমী। রিপন আজ রেশমীকে ভালবাসার কথা বলবে। ওইতো রেশমী আসছে। রেশমী এগিয়ে এলে দু’জনে এক সাথে ক্লাসের দিকে এগিয়ে যায়। রেশমী আর রিপনের ক্লাস রুম পাশাপাশি। আজ ক্লাস শেষে যাওয়ার সময় কোন একখানে বসে রেশমীকে ভালবাসার কথা বলবে রিপন।
কলেজ ছুটির পর আবার রেশমীকে বাইকে ওঠার প্রস্তাব করে রিপন। আপত্তি করেছিল রেশমী। কিন্তু রিপন শুনেনি। বলেছে একই পথ,আলাদা যাবে কেন। আমি নামিয়ে দেব। রেশমীকে বাইকে নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা করতে থাকে রিপন। কিন্তু কোথাও বসার কথা বলার সাহস পায়নি। কোথায় যেন,একটা দ্বিধা কাজ করছিল রিপনের। সে ভাবে,থাকনা আরো ক’য়েকটা দিন যাক। তার পর না হয় বলব।ভাবতে ভাবতে পথ শেষ হওয়ায় রেশমীকে তার বাড়ীর মোড়ে নামিয়ে দিয়ে আসে রিপন।
রিপন আর রেশমীর কলেজ জীবন এগিয়ে চলছে। আজ বহু দিন। রিপন প্রতিদিন সকালে কলেজে রেশমীর সাথে দেখা করে।  দুজন এক সাথে ক্লাসে যায়। আসার সময় রেশমীকে বাইকে নিয়ে তার বাড়ীর মোড়ে নামিয়ে দিয়ে আসে। কিন্তু ভালবাসি কথাটি রিপন আজও রেশমীকে বলতে পারেনি। রেশমীর মোবাইল নাম্বার নিয়েছে রিপন। রেশমীর কাছেও আছে রিপনের নাম্বার। তারা মাঝে মধ্যে মোবাইলে কথা বলে। কিন্তু ভালবাসি কথাটি রিপন বলতে পারেনি আজও।
সহপাঠীদের এখন সময় দেয়না রিপন। কলেজে সকালেও রেশমী। ছুটির পরেও রেশমী। বাড়ী ফেরার সময়ও রেশমীকে নিয়ে ফেরা। রিপনের কাছে এখন রেশমী ছাড়া আর কারও কোন গুরুত্ব নেই। সহপাঠীদের অনেকে বলেছে,তুই রেশমীকে ভালবাসিস,একথা বলেদে। না পারলে বল তোর হয়ে আমরা বলছি,কিন্তু রাজী হয়নি রিপন। সে বলেছে,আমরা তো এক সাথে আছি। সময় হলে ঠিক বলব। সহপাঠীরা বলেছে,দেখ তুই বলার আগে,আবার অন্য কেউ রেশমীকে যেন, ভাগিয়ে নিয়ে না যায়। রিপন বলেছে,এমন কিছু হবেনা। রেশমী শুধু আমার।
রিপনের কাছে মনে হয়,রেশমী তাকে ভালবাসে। কারন কলেজে রেশমী তাকে ছাড়া অন্য আর কারও সাথে কথাও বলেনা। কারো সাথে রেশমী মিশে না। কলেজ জীবনে,রেশমীর সাথে শুধু জড়িয়ে আছে রিপন। রিপন ভাবছে না আর দেরী করবে না। কাল কলেজের বার্ষীক ক্রীড়া প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠানের ফাকে সে রেশমীকে তার ভালবাসার কথা বলবে। রেশমী কাল কলেজের অনুষ্ঠানে শাড়ী পড়ে আসবে। আজ বাইকে আসার সময় রিপনকে বলেছে রেশমী। রিপনও বলেছে,ও কাল পান্জাবী-পায়জামা পড়ে আসবে। রিপনের এ কথা শুনে হেসেছে রেশমী।
কলেজের অনু্ঠান বার’টায় শুরু হবে। সাড়ে’এগারটার দিকে পায়জামা-পান্জাবী
পড়ে বাইক নিয়ে বের হয় রিপন।কলেজে পৌছার আগে রাস্তায় অনেক মানুষের জটলা দেখতে পায় রিপন। পাশে একটি রিকসা দুমড়ে-মুচরে পড়ে আছে। মনে হয় এক্সিডেন্ট হয়েছে। একজন লোককে জিজ্ঞেস করলে জানায়,একটি ট্রাক যাত্রীবাহী রিকসায় ধাক্কা মেরেছে। রিকসা চালকের তেমন কিছু হয়নি। তবে একজন মহিলা যাত্রী ছিল। তার অবস্থা খুব খারাপ। মনে হয় বাঁচবেনা।
রিপন বাইকটা সাইডে রেখে ভীড় ঠেলে কাছে যায়। একি দেখছে রিপন। তার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। নির্বাক হয়ে যায় রিপন। এতো তার রেশমী। ওর ভালোবাসা। রিপনের জীবন। নিজেকে আর সামলাতে পারেনা রিপন। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে সে। পরম আবেশে জড়িয়ে ধরে রেশমীর রক্তে ভেজা শরীর। তখনও শ্বাস আছে রেশমীর। রেশমী তার চোঁখ দু’টো একবারের জন্য খোলে। তাকিয়ে দেখে রিপনকে। তার দু’চোঁখ দিয়ে দু’ফোটা পানি ঝড়ে পড়ে।এ সময় রেশমী তার দু’হাত দিয়ে রিপনের হাত জড়িয়ে ধরে। রিপন রক্তে ভেজা রেশমীর শরীরটা ধরে চিৎকার করে কাঁদছে। সে ভীর করে থাকা লোকজনকে ঁঅনুরোধ করে তাকে সাহায্য করার জন্য। রেশমীকে সে হসপিটালে নিয়ে যাবে। নিজের জীবন দিয়ে হলেও রেশমীর জীবন বাঁচাবে সে। ভীরের মধ্যে থেকে একজন লোক এসে রেশমীর ডান হাতের নাড়ী দেখে বলে,নাই। মারা গেছে!  একথা শুনে আত্মচিৎকার করতে থাকে রিপন। সে চিৎকার করে বলতে থাকে আমার রেশমী মরতে পারেনা। সে বেঁচে আছে। তাকে সে হসপিটালে নিয়ে যাবে। নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও,রেশমীর জীবন সে বাঁচাবে।
ইতিমধ্যে থানা পুলিশ এসে গেছে। তারা রেশমীর শরীর পরীক্ষা করে জানায়, মারা গেছে! লাশ থানায় নিয়ে যাবে। আর নিজেকে সামলাতে পারেনা রিপন। তার হৃদয়টা ভেঙ্গে গেছে। সে আর বেঁচে থেকে কি করবে। মাটিতে গড়িয়ে পড়ে বুক চাপড়ে কাঁদতে থাকে রিপন। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে রিপনকে সরিয়ে দেয়। তারা রেশমীর লাশটা প্যাকেট করে থানায় নিয়ে যায়। খবর পেয়ে রিপনের সহপাঠী,শিক্ষকসহ শিক্ষার্থীরা এসেছে। সবাই কাঁদছে। সবার চোঁখে অশ্রু। রিপনের সহপাঠীরা রিপনকে জড়িয়ে ধরে আছে। সবাই তাকে সান্তনা দিচ্ছে। কেউ রিপনকে থামাতে পারছেনা। আহাজারী করে কাঁদছে রিপন।
কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। রেশমী হত্যার বিচারের দাবিতে শ্লোগানের ঝড় তুলেছে ওরা। ওদের শ্লোগানে প্রকম্পিত হচ্ছে শহর। চেয়ে চেয়ে দেখছে রিপন। আর কাঁদছে। এ আন্দলনে সে কি তার,রেশমীকে ফেরত পাবে।
রেশমীর বাবা-মা থানায় এসে পোষ্ট মর্ডেম ছাড়াই দাফনের অনুমতি নিয়ে,রেশমীর লাশ নিয়ে গেছে। বাদ মাগরিব রেশমার জানাযা ও দাফন।
রিপনের সহপাঠীরা রিপনকে ধরে তার বাড়ীতে নিয়ে আসে। রিপনের বাবা-মা রিপনকে দেখে চিনতেই পারেনা। পুরো শরীরের জামা কাপড় রক্তে ভেজা। চোঁখ-মুখেও রক্তের দাগ। ভয় পেয়ে যায়,রিপনের বাবা-মা। রিপন পাগলের মত আচরন করছে। কিছুতেই থামানো যাচ্ছেনা রিপনকে। রিপনের সহপাঠীরা রিপনের বাবা-মাকে সব বুঝিয়ে বলে। ছেলের এমন অবস্থা দেখে এবং রেশমীর অকাল মৃত্যুর খবরে কেঁদে ফেলেন, রিপনের বাবা-মা। তারা রিপনকে বিভিন্ন সান্তনা দেন। কিন্তু কোন ভাবে বোঝানো যায় না রিপনকে। সে বিলোপ করে যাচ্ছে।
রিপনের সহপাঠীরা রিপনকে গোসল করিয়ে সাথে করে নিয়ে আসে। রেশমীর জানাযায়!  জানাযা শেষে রেশমীর কবরে মাটি দিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে রিপন। কান্নার এক পর্যায় রেশমীর কবরে লুটিয়ে পড়ে রিপন। রিপনের সহপাঠীরা পাজা করে ধরে রিপনকে সরিয়ে আনে। সান্তনা দেয়। কিন্তু রিপন নিজেকে কোন ভাবে সামলাতে পারেনা। এবার এগিয়ে আসে রেশমীর বাবা। রিপনের সহপাঠীদের কাছে সব কথা শুনে। রিপনকে রেশমীর বাবা নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে। এর পর কাঁদতে থাকে। রিপন ও কাঁদে,রেশমীর বাবাও কাঁদে। কাঁদতে থাকে তারা দু,জনে।
রেশমীর বাবা এবার,সান্তনা দেয় রিপনকে। বলে বাবা,আজ থেকে তুমি,আমার ছেলে। রেশমী নেই! তুমি আমার ছেলে হিসেবে,আজীবন আমার বুকে থাকবে।রিপন কাঁদছে,তার এ কান্না,কোন ভাবেই থামেনা। কান্নার মাঝে রিপনের মনে ভাসে,”ভালবাসি”কথাটি হয়নি বলা।
Related Posts
ছোট গল্প “দ্বি-চারিনী”।
"দ্বি-চারিনী"   ফয়েজ আহমেদ।   রাস্তা দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় একটি পরিচিত নারী কন্ঠ ভেসে আসে সাকিলের কানে। কন্ঠটা রাস্তার পাশের ওই বাড়ীটা থেকে আসছে। বাড়ীটা সাকিলের পরিচিত। আব্দুল হকের বাড়ী। সাকিলের এক কাছের ...
READ MORE
ফয়েজ আহমেদ’র এর গল্প “অসম প্রেম পরিনতি”
মাসুদ পার্কে বসে আছে। রীতা মাসুদকে জরুরী ভাবে এখানে আসতে বলেছে। আজ রীতা আর মাসুদের ভালবাসার পরিনতির ফায়সালা হবে।  চুড়ান্ত বোঝা-পড়া হবে।ভালবাসা নিয়ে টানপোড়েন নিষ্পতি করবে ওরা। ক'দিন থেকে রীতা ...
READ MORE
“বিদ্রোহী সত্তা”
                            "বিদ্রোহী সত্তা"                               ...
READ MORE
ফয়েজ আহমেদ’র গল্প “মানবতা’।
"মানবতা"   -ফয়েজ আহমেদ।     রাস্তায় একটা জটলা দেখা যাচ্ছে।এগিয়ে যায় সুমন। একটা লোক চিৎ হয়ে পড়ে আছে। মনে হয় অজ্ঞান হয়ে গেছে। একজন বলে,লোকটা অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েছিল। অজ্ঞান পার্টি আবার কি। জানেনা ...
READ MORE
ফয়েজ আহমেদ’র কবিতা  “যুদ্ধ চাই”
যুদ্ধ চাই" -ফয়েজ আহমেদ যুদ্ধ চাই,ভৌগলিক রেখার নয় স্বাধীনতা চাই,সেই পতাকার নয়, সংগ্রাম চাই,রুখতে,অশুভ ব্যাধি আরেকটি যুদ্ধ চাই,করতে শুদ্ধির।   যুদ্ধ চাই আনতে,শুভ রাজনীতি অফিস-আদালত হবে,মুক্ত র্দূনীতি, সামাজিক স্তরে চাই,প্রকৃত সেবা যুদ্ধ চাই মোরা,সুশাসন প্রতিষ্ঠার।   যুদ্ধ চাই,আনতে মানবতার সুদিন গাইবে সবাই,মানবিক গান ...
READ MORE
“ভাষা”
"ভাষা"   ফয়েজ আহমেদ   বাংলা মোদের,মায়ের ভাষা বাংলা মোদের,হৃদয় আশা, বাংলা ভাষায় বলি কথা বাংলায় দেখি,স্বপ্ন আশা।   বাংলা ছিল,মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে,চাইলো ওরা, মুখে মোদের,চাইলো দিতে বসায় ওদের,নিজের ভাষা।   গর্জে উঠল,আমার ভাইরা বাংলা রবে,মোদের ভাষা, মিছিল-মিটিং,করছে তারা মানবো নাতো,ওদের কথা।   চলছে এবার,মিছিল মিটিং সামাল দেয়া,হয়েছে কঠিন, ছাত্র-জনতা,বেধেছে ...
READ MORE
“স্বাধীনতার রুপকার”
"স্বাধীনতার রুপকার" -ফয়েজ আহমেদ।   বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন ছিলনা। ছিল পরাধীন। নাম ছিল পুর্ব পাকিস্থান। ইংরেজ শাসনের অবসানের পর ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দু'টি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। একটি ভারত ও অপরটি পাকিস্থান। পাকিস্থান ...
READ MORE
“কবর পেল শাবনুর”
"কবর পেল শাবনুর"   -ফয়েজ আহমেদ।   মেয়ের সাথে ফোনে কথা বলে অঝোরে কাঁদতে থাকে আবুল হোসেন। একটি মাত্র মেয়ে তার। আর কোন ছেলে পুলে নেই। অভাবের তাড়নায় মেয়েটিকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল আবুল হোসেন। মেয়েটিকে ...
READ MORE
ফয়েজ আহমেদ এর ছোট গল্প “আজব স্বপ্ন”।
"আজব স্বপ্ন"   -ফয়েজ আহমেদ।   গ্রামের নাম কাজলীয়া। সবুজ ঘেরা সুন্দর একটি গ্রাম। যতদুর চোঁখ যায়,শুধু প্রকৃতিক সবুজ লীলা ভূমি। গ্রমের লোকজন অত্যান্ত শান্তি প্রিয়। তারা সকলে ওই গ্রামে মিলে মিশে বসবাস করেন। ...
READ MORE
ফয়েজ আহমেদ’র ছোট গল্প “রহিমুদ্দিনের কৃতজ্ঞতা”
"রহিমুদ্দিনের কৃতজ্ঞতা"   ( করোনা কালের একটি ছোট গল্প )   -ফয়েজ আহমেদ।   রহিমুদ্দিনের চোঁখ দিয়ে নিরবে পানি ঝড়ছে। একটা বোবা কান্না তার বুক চিড়ে বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু সে কাদতে পারছেনা। রাত ৩ টা ...
READ MORE
ছোট গল্প “দ্বি-চারিনী”।
ফয়েজ আহমেদ’র এর গল্প “অসম প্রেম পরিনতি”
“বিদ্রোহী সত্তা”
ফয়েজ আহমেদ’র গল্প “মানবতা’।
ফয়েজ আহমেদ’র কবিতা “যুদ্ধ চাই”
“ভাষা”
“স্বাধীনতার রুপকার”
“কবর পেল শাবনুর”
ফয়েজ আহমেদ এর ছোট গল্প “আজব স্বপ্ন”।
ফয়েজ আহমেদ’র ছোট গল্প “রহিমুদ্দিনের কৃতজ্ঞতা”
Spread the love
শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।